
জহির উদ্দিন মাহমুদঃ
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন—সব ক্ষেত্রেই ইসলাম সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রদান করেছে। পরিবার হলো সমাজের মূল ভিত্তি। আর পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক।
সন্তান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে পিতা-মাতার জন্য একটি আমানত ও নিয়ামত। অন্যদিকে পিতা-মাতাও সন্তানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহের মাধ্যম। তাই উভয়েরই একে অপরের প্রতি দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। ইসলাম যেমন পিতা-মাতাকে সন্তানের লালন-পালন, শিক্ষা ও নৈতিক গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে, তেমনি সন্তানকে পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সেবা ও আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পর বহু জায়গায় পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের কথা উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা কত মহান।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার কর্তব্যঃ
সন্তান জন্মের পর শুধু তার খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই পিতা-মাতার দায়িত্ব নয়; বরং তাকে একজন সৎ, নৈতিক, দায়িত্বশীল ও আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও মমতা
সন্তানের প্রতি ভালোবাসা তার মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিতা-মাতার উচিত সন্তানের সঙ্গে কোমল আচরণ করা, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাকে ভালোবাসা প্রকাশ করা।
রাসুলুল্লাহ(সঃ) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের আদর করতেন এবং তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতেন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ( সঃ) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন—“যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।”(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
অতএব, সন্তানের সঙ্গে অকারণে কঠোরতা, অপমান বা অবহেলা করা ইসলামের আদর্শ নয়।
সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হলো তার জন্য সুন্দর ও অর্থবহ নাম নির্বাচন করা। ইসলামে নামের গুরুত্ব রয়েছে। এমন নাম রাখা উচিত যার অর্থ ভালো এবং যা সন্তানের জন্য সম্মানজনক।
রাসুলুল্লাহ(সঃ) অনেক সময় মানুষের খারাপ অর্থের নাম পরিবর্তন করে সুন্দর নাম রেখেছেন।
তাই সন্তানের নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার সচেতন হওয়া উচিত।
সন্তানের খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা পিতা-মাতার দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন—“সন্তানের পিতার ওপর তাদের খাদ্য ও পোশাকের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।”(সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)
অর্থাৎ সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানের প্রয়োজনীয় ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পিতার ওপর রয়েছে।
সন্তানের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ঈমান ও তাওহিদের শিক্ষা। পিতা-মাতার উচিত ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে আল্লাহর পরিচয়, আল্লাহর একত্ববাদ, নবী-রাসুল, আখিরাত এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।
পবিত্র কোরআনে হযরত লোকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে প্রথমেই তাওহিদের শিক্ষা দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন—“হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।”
(সূরা লোকমান: ১৩)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, সন্তানের চরিত্র গঠনের প্রথম ধাপ হলো তাকে সঠিক ঈমানের শিক্ষা দেওয়া।
সন্তানকে নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করা পিতা-মাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন—“তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং নিজেও তাতে অবিচল থাকো।”(সূরা ত্বহা: ১৩২)
রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন—“তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।”(সুনান আবু দাউদ)
এখানে উদ্দেশ্য হলো বয়স ও সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুকে ধীরে ধীরে নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা।
সন্তানকে শুধু পার্থিব শিক্ষা দিলেই পিতা-মাতার দায়িত্ব সম্পূর্ণ হয় না। তাকে কোরআন, হাদিস, ইসলামী আদব-আখলাক এবং হালাল-হারামের প্রাথমিক জ্ঞানও শিক্ষা দিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন—“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
সুতরাং সন্তান কী শিখছে, কার কাছ থেকে শিখছে এবং তার চিন্তা-চেতনা কীভাবে গড়ে উঠছে—এসব বিষয়ে পিতা-মাতার দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
সন্তানকে সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, বড়দের সম্মান এবং ছোটদের স্নেহ করার শিক্ষা দিতে হবে।
শুধু মুখে উপদেশ দিলেই হবে না; পিতা-মাতাকেও নিজেদের জীবনে এসব গুণের বাস্তব উদাহরণ তৈরি করতে হবে। কারণ সন্তান পিতা-মাতার আচরণ দেখে বেশি শেখে।
একাধিক সন্তান থাকলে তাদের প্রতি ভালোবাসা, উপহার ও আচরণে অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ(সঃ) সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। হযরত নু‘মান ইবন বশীর (রা.)-এর ঘটনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ পিতা-মাতাকে সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তাই কোনো সন্তানকে অতিরিক্ত ভালোবাসা দেখিয়ে অন্য সন্তানকে অবহেলা করা উচিত নয়।
পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে নিরাপদ পরিবেশে বড় করা। তার ভয়, দুঃখ, উদ্বেগ, ব্যর্থতা ও সমস্যাগুলো গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত।
সন্তান ভুল করলে তাকে অপমান না করে ভুলটি বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। অতিরিক্ত গালাগালি, অপমান ও ভয় দেখানো সন্তানের ব্যক্তিত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তানের খাদ্য, পোশাক ও শিক্ষা-দীক্ষায় হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। পিতা-মাতার উচিত হারাম উপার্জন থেকে নিজেদের ও সন্তানদের রক্ষা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।”(সূরা আত-তাহরিম: ৬)
এই আয়াতের মধ্যে পরিবারকে দ্বীনের শিক্ষা ও সঠিক পথে পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথাও রয়েছে।
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যঃ
ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু। আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পর পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন
আল্লাহ তাআলা বলেন—“তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে।”(সূরা আল-ইসরা: ২৩)
এরপর আল্লাহ বলেন—
“তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।”(সূরা আল-ইসরা: ২৩)
এ আয়াত পিতা-মাতার সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ইসলামের অসাধারণ সৌন্দর্য তুলে ধরে।
পিতা-মাতাকে ‘উফ’ পর্যন্ত না বলা
‘উফ’ একটি সামান্য বিরক্তির প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা যখন সামান্য বিরক্তির শব্দ পর্যন্ত নিষেধ করেছেন, তখন পিতা-মাতাকে গালাগালি, অপমান, ধমক বা কষ্ট দেওয়া কত বড় অপরাধ—তা সহজেই বোঝা যায়।
তাই সন্তানকে সবসময় ভদ্র ও নম্র ভাষায় পিতা-মাতার সঙ্গে কথা বলতে হবে।
বিশেষ করে পিতা-মাতা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, তখন তাঁদের সেবা করা সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আল্লাহ বলেন—“আর তাদের জন্য দয়ার সঙ্গে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁরা যেমন শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি তাঁদের প্রতি দয়া করুন।’”+সূরা আল-ইসরা: ২৪)
সন্তানের শৈশবে পিতা-মাতা যেমন রাত-দিন পরিশ্রম করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের দেখাশোনা করা সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
সন্তানের উচিত নিয়মিত পিতা-মাতার জন্য দোয়া করা।
কোরআনের সুন্দর দোয়া হলো—
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
অর্থ:
“হে আমার প্রতিপালক! তাঁরা যেমন শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি তাঁদের প্রতি দয়া করুন।”(সূরা আল-ইসরা: ২৪)
পিতা-মাতা জীবিত থাকুন বা ইন্তেকাল করুন—তাঁদের জন্য দোয়া করা সন্তানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
সন্তানের উচিত কখনো উচ্চস্বরে, রূঢ় ভাষায় বা অবজ্ঞার সঙ্গে পিতা-মাতার সঙ্গে কথা না বলা।
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ব্যস্ততার কারণে অনেক সন্তান পিতা-মাতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সময় কাটায় না। এটি পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল করে।
প্রতিদিন কিছু সময় তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের খোঁজ নেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পিতা-মাতার বৈধ ও ন্যায়সংগত নির্দেশ পালন করা সন্তানের দায়িত্ব।
তবে কোনো বিষয়ে পিতা-মাতা যদি আল্লাহর অবাধ্যতার নির্দেশ দেন, তাহলে সে নির্দেশ পালন করা যাবে না। কিন্তু তখনও তাঁদের সঙ্গে অসদাচরণ করা যাবে না।
আল্লাহ বলেন—“যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছু শরিক করতে বাধ্য করে, যার কোনো জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের আনুগত্য করবে না; তবে দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।”(সূরা লোকমান: ১৫)
অর্থাৎ অবাধ্যতার ক্ষেত্রেও পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ বজায় রাখতে হবে।
পিতা-মাতার জীবদ্দশায় যেমন তাঁদের সম্মান করা উচিত, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পরও তাঁদের বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখা উচিত।
এটি পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার একটি সুন্দর প্রকাশ।
পিতা-মাতা ইন্তেকাল করার পর সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তাঁদের জন্য দোয়া করা, তাঁদের ঋণ পরিশোধে সহযোগিতা করা, তাঁদের বৈধ অঙ্গীকার পূরণ করা এবং তাঁদের আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ(সঃ) বলেছেন—“মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা উপকার লাভ করা হয়, অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।”(সহিহ মুসলিম)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নেক সন্তান পিতা-মাতার জন্য মৃত্যুর পরও উপকারের মাধ্যম হতে পারে।
পিতা-মাতার মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসঃ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন—“আমার উত্তম সাহচর্য পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে?”
রাসুলুল্লাহ(সঃ)বললেন—“তোমার মা।”
লোকটি জিজ্ঞাসা করলেন, “তারপর কে?”
তিনি বললেন, “তোমার মা।”
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, “তারপর কে?”
তিনি বললেন, “তোমার মা।”
সে আবার জিজ্ঞাসা করল, “তারপর কে?”
তিনি বললেন, “তোমার বাবা।”
—(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসে মায়ের প্রতি বিশেষ যত্ন ও সম্মানের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
ইসলামে পিতা-মাতার অবাধ্যতা গুরুতর গুনাহ। তাদের প্রতি অন্যায় করা, অপমান করা, অকারণে কষ্ট দেওয়া কিংবা বৃদ্ধ বয়সে অবহেলা করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
রাসুলুল্লাহ(সঃ) বড় গুনাহগুলোর মধ্যে পিতা-মাতার অবাধ্যতার কথা উল্লেখ করেছেন।
তাই সন্তানদের মনে রাখতে হবে—পিতা-মাতার সঙ্গে খারাপ আচরণ কোনো সাধারণ বিষয় নয়। তাঁদের সম্মান ও সেবা করা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ইসলাম পিতা-মাতাকে সম্মান করতে বলেছে, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পিতা-মাতার সব কাজই সঠিক হবে।
পিতা-মাতারও ভুল হতে পারে। কোনো বিষয়ে মতের অমিল হলে সন্তানের উচিত উত্তেজিত না হয়ে বিনয়ের সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করা।
কোনো অন্যায় বা হারাম কাজের নির্দেশ দেওয়া হলে তা পালন করা যাবে না। কিন্তু বিরোধের সময়ও শালীনতা ও সম্মান বজায় রাখতে হবে।
আধুনিক সমাজে পিতা-মাতা ও সন্তানের দায়িত্ব
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যস্ত জীবন ও পারিবারিক পরিবর্তনের কারণে পিতা-মাতা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
একদিকে পিতা-মাতার উচিত সন্তানের হাতে শুধু মোবাইল তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে না করা। অন্যদিকে সন্তানেরও উচিত মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে পিতা-মাতার ভালোবাসা ও সেবার বিকল্প না বানানো।
পরিবারে নিয়মিত কথা বলা, একসঙ্গে সময় কাটানো, নামাজ পড়া, কোরআন শেখা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
পিতা-মাতা ও সন্তানের পারস্পরিক ভালোবাসা
একটি আদর্শ পরিবার একতরফা দায়িত্বে গড়ে ওঠে না। পিতা-মাতা যেমন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করবেন, তেমনি সন্তানও পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করবে।
পিতা-মাতা সন্তানের জন্য ত্যাগ করবেন, সন্তান বড় হয়ে পিতা-মাতার সেবা করবে। পিতা-মাতা সন্তানকে শিক্ষা দেবেন, সন্তান তাঁদের সম্মান করবে। পিতা-মাতা সন্তানের ভুল ক্ষমা করবেন, সন্তানও তাঁদের ভুলকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে।
এভাবেই একটি পরিবার শান্তি, ভালোবাসা ও আল্লাহর রহমতের আবাসে পরিণত হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায় যে,
পিতা-মাতা ও সন্তানের সম্পর্ক আল্লাহর দেওয়া এক মহান নিয়ামত। এই সম্পর্ককে সুন্দর, পবিত্র ও শক্তিশালী রাখার জন্য ইসলাম অত্যন্ত সুন্দর নির্দেশনা দিয়েছে।
পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে ভালোবাসা, ভরণ-পোষণ করা, নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া, সুশিক্ষা দেওয়া, ঈমান ও নামাজের শিক্ষা দেওয়া এবং উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলা।
অন্যদিকে সন্তানের দায়িত্ব হলো পিতা-মাতাকে সম্মান করা, তাঁদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলা, বৈধ বিষয়ে তাঁদের আনুগত্য করা, তাঁদের সেবা করা, তাঁদের প্রয়োজন পূরণে পাশে থাকা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করা।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত কোরআন ও সুন্নাহর এই নির্দেশনাগুলো নিজেদের পরিবারে বাস্তবায়ন করা। কারণ একটি আদর্শ পরিবার থেকেই একটি আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পিতা-মাতার হক আদায় করার এবং সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন করার তাওফিক দান করুন। আমাদের পরিবারগুলোকে ভালোবাসা, ঈমান, তাকওয়া ও শান্তিতে পরিপূর্ণ করুন।
আমিন।
জহির উদ্দিন মাহমুদ
সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক,কলামিস্ট
ও মানবাধিকার কর্মী।